বঙ্গবন্ধু নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর ঔদ্ধত্য মেনে নেওয়ার নয়

কয়েক দিন আগে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়েছিলাম। ইতিহাসের ঠিকানা বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে এক অনুজের সংবর্ধনা সভায়। আমার কাজের জায়গা বাংলাদেশ প্রতিদিন ও লেখালেখি আর সীমিত কয়েকজনের সঙ্গে আড্ডা ছাড়া সবকিছু থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। কোনো সেমিনার, গোলটেবিল এমনকি টেলিভিশন টকশোতেও আগের মতো যাই না। মূল্যবোধের সর্বগ্রাসী অবক্ষয়ে পতিত সমাজ ও আদর্শহীন রাজনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজদুর্নীতির যে বীভৎস চিত্র আমাদের বোধহীন করেছে, সেখানে বিষাদভরা মন নিয়ে পড়ে থাকি। ৩২ নম্বরে গিয়েছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন শফিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় তাকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।

’৭৫-এর হত্যাকা-ের পর সেনাশাসনকবলিত অন্ধকার কঠিন সময়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির জন্য সময়টা ছিল চরম বৈরী। সেদিন বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা রীতিমতো একঘরে হয়ে চতুর্মুখী আক্রমণের মুখে জাতির মহান নেতার আদর্শেই ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। একদিকে সামরিক শাসক ও তাঁর পেটোয়া বাহিনীর দোর্দ- প্রতাপ, চরম দমন-পীড়ন আরেকদিকে অতিবিপ্লবী ও উগ্রপন্থিদের বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগবিদ্বেষী হিংস্রতা প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করে। মিত্ররা ছিল চতুর। স্কুলজীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন পর্যন্ত ছাত্রলীগের রাজনীতির প্রতি নিবেদিত ছিলাম। আমার আবেগ, অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজন্ম বহমান। তিনিই আমার একমাত্র নেতা। শফিকের সংবর্ধনা সভায় রাকসুর সাবেক ভিপি দুঃসময়ের নেতা নূরুল ইসলাম ঠা-ুর সঙ্গেই দেখা হয়নি, সেই কঠিন পরিস্থিতিতে সেখানে সংগঠনের হাল ধরা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সারোয়ার জাহান বাদশাহ এমপির সঙ্গেও দেখা হয়েছে। আমাদের পরের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট লায়েব উদ্দিন লাভলুও এসেছিল। অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বুদুর দেখা পেলে ভালো লাগত। সামরিক শাসনকবলিত সময়ের মতিহারে অকালপ্রয়াত ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান গিয়েছিলেন আমতলায় ছাত্রলীগের সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তখন ক্যাম্পাসে অতিবিপ্লবী ও উগ্রপন্থিদের অস্ত্রনির্ভর রাজনীতির দাপুটে সময়। উগ্রপন্থি একটি ছাত্র সংগঠনের অস্ত্রবাজরা সভায় হামলা করেছিল। সামরিক শাসন যুগের রাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগকে সংগ্রাম পরিষদের প্যানেলের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করতে হয়। ছাত্রলীগের সেদিন শক্তি ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, আর প্রতিদ্বন্দ্বীদের সশস্ত্র রাজনীতি। পাবনার আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম বকুল তাঁর কর্মীবাহিনী ও জিপ দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছিলেন। ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের সাবেক সব নেতা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব এখন বিএনপিতে চলে গেলেও সেদিন অতিবিপ্লবী অস্ত্রবাজ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে মতিহারে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আপনাদের কেউ যদি আমার ছাত্রলীগের কারও গায়ে ফুলের ছিটা দেয়, মধুর ক্যান্টিন থেকে আমি আপনাদের সংগঠনকে নিষিদ্ধ করে দেব।’ সেই নির্বাচনে আমরা বিজয়ী হইনি, কিন্তু সংগঠন শক্তিশালী হয়েছিল। সেই অতিবিপ্লবী ও উগ্রপন্থিরা এখন রাজনীতিতে দেউলিয়া ও নির্বাসিতপ্রায়। সেদিনের বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষীরা একালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার অসীম করুণায় ক্ষমতার রাজনীতির অংশীদারিত্ব নিয়ে বেঁচে আছেন।

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের মহাদুঃসময়ের লড়াই সংগ্রামে সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েও আজ অনেকে দলের কোথাও নেই। সারা দেশে অভিন্ন চিত্র। পঁচাত্তর-উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ যাঁরা সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করেছেন, নিজেদেরও নেতৃত্বের আলোয় আলোকিত করেছেন তাঁদের বড় অংশ আওয়ামী লীগের কোথাও নেই। ওবায়দুল কাদের দলের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন, মন্ত্রীও আছেন; জাহাঙ্গীর কবির নানক দলের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও আবদুর রহমান প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েছেন। আর কেউ কোথাও নেই। চট্টগ্রামের খোরশেদ আলম সুজনের কপালে কিছু জোটেনি। রাকসুজয়ী সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির রানার কপাল খোলেনি। রাবির সাবেক সভাপতি আমিরুল আলম মিলন দলের ওয়ার্কিং কমিটিতে ঠাঁই পাওয়ার পর এবার বাগেরহাটের উপনির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন।

এত কথা লেখার কারণ, রাজনীতি শুধু রাজনীতিবিদদের হাতছাড়াই হয়নি, আওয়ামী লীগের মতো পোড় খাওয়া কর্মীর দলেও হঠাৎ নেতা হওয়ার সুযোগ ঘটেছে অনেক আগেই। কেউ বাবার পরিচয়ে, কেউ বা নানা পথে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি একজন উচ্চশিক্ষিত মর্যাদাবান নারীই নন, ১৯৫৩-৫৪ সালের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ ওয়াদুদের কন্যাও। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে এম এ ওয়াদুুদের অবদান বর্ণাঢ্য। ইত্তেফাকের দুঃসময়ে তিনি নির্ভরতার জায়গায় ছিলেন। ডা. দীপু মনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে মেধাবী ছাত্রী হিসেবে এমবিবিএস পাস করে পশ্চিমা শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন। ঢাকা মেডিকেলে পড়াশোনাকালে তিনি সন্ধানীর সভাপতি ছিলেন। কিন্তু ছাত্রলীগের রাজনীতিতে কোনো পর্যায়ে নেতৃত্বের সঙ্গে ছিলেন না। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে আইভি রহমান যিনি একুশের গ্রেনেড হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন, তিনি মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হওয়ায় আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তখন আচমকা এই শূন্যপদে ডা. দীপু মনি উঠে আসেন। হঠাৎ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া সৌভাগ্যবতী ডা. দীপু মনিকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ব্যালট বিপ্লবে বিশাল বিজয় এনে মহাজোট সরকার গঠন করলে ডা. দীপু মনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। দলেও পদোন্নতি নিয়ে দুবার যুগ্মসাধারণ সম্পাদক। এবার তিনি শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন। রাজনীতিবিদদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, অনেকেই আজন্ম গণমানুষের সঙ্গে কর্মীবান্ধব চরিত্র নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামের ভিতর দিয়ে নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসে, বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিয়েও না পান দলীয় পদবি, না হন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। আরেকদিকে ডা. দীপু মনিরা হঠাৎ আসেন, দেখেন আর সব জয় করেন। তাঁর মেধা, যোগ্যতা ও সততা নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু এই থরথর করে একের পর এক প্রাপ্তিযোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেই প্রশ্নের হিসাব মিলবে না। এ দেশে এখন হঠাৎ নেতা, হঠাৎ এমপি, হঠাৎ মন্ত্রী অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারপ্রধান যেমন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, তেমনি এটাও সত্য, সবচেয়ে দুর্বল মন্ত্রিসভা এখন দেশে বহাল। এঁদের অনেকের না আছে নেতৃত্বের দাপট, না আছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, না আছে গণমানুষের নেতা হয়ে রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাস রচনা করে আসার বর্ণাঢ্য অতীত। তাই একদল আমলা এঁদের কারণে এতটাই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর বদলে নিজেরা শাসকের ভূমিকায় দৃশ্যমান হচ্ছে। রাজনীতিবিদরা একদিকে বিতর্কিত হচ্ছেন, আরেকদিকে দেশ-বিদেশে আমলাদের একাংশের অর্থসম্পদ বাড়ছে। তারা বিতর্কের বাইরে থাকছেন আর অপরিপক্ব মন্ত্রী ও হঠাৎ নেতাদের রাজনীতিতে আগমনের সুবাদে নিজেদের ক্ষমতার কেন্দ্রেই নেননি, অবসরের পর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এমনকি রাজনীতিতে এসে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার খায়েশও বাড়িয়েছেন।

যাক সেসব কথা, এ রাজনীতি জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্যের। আমি যে কথাটি বলতে চেয়েছি, তা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহচর এম এ ওয়াদুুদের যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মেধা, আবেগ, অনুভূতি ছিল, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সহচর ডা. দীপু মনির তা নেই। তিনি উচ্চশিক্ষিত বিদুষী নারী হলেও রাজনীতির পাঠশালায় কতটা শিশু, কতটা বোধহীন, কতটা অপরিপক্ব তা সর্বশেষ তাঁকে ঘিরে ওঠা ঝড় দৃশ্যমান করেছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ফেব্রুয়ারির শেষ দিন বগুড়া পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবনির্মিত বঙ্গবন্ধু একাডেমিক ভবনের উদ্বোধন করেন। তিনি সেখানে গেলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির মুখোশ পরে শিক্ষামন্ত্রীকে শিক্ষার্থীরা স্বাগত জানায়। এ ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড়ই ওঠেনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে যায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখোশ পরে অভ্যর্থনা জানানোর বিকৃত চিন্তা সেই প্রতিষ্ঠানের যারা করেছিলেন, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ছিল। তা না করে তিনি বঙ্গবন্ধুর মুখোশ পরা শিক্ষার্থীদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করেছেন। এর মানে হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর প্রতীকী রূপ নিয়েই শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, আর তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এ ঘটনা বঙ্গবন্ধু-অন্তপ্রাণ লাখ লাখ মানুষকে কতটা ব্যথিত করেছে, কতটা রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে তা আমি জানি না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি আজন্ম নত আমার বিশ্বাস, চিন্তা, চেতনা, আবেগ, অনুভূতির জায়গা থেকে হৃদয়টাই ভেঙে যায়নি, মনে হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর এই সীমাহীন ঔদ্ধত্য গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা একটা অনুভূতিহীন, জবাবদিহিবিহীন অসাড় রাজনৈতিক সমাজে বাস করছি। তাই বলে কি জাতির পিতার প্রতি অবমাননার এই ধরনের নির্লজ্জ ঔদ্ধত্যপনাকেও মেনে নিতে হবে? এটা মেনে নেওয়া যায় না।

মাঝেমধ্যে মনে হয়, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা চারদিকে একদল মোসাহেব, চাটুকারের দেয়ালে আটকা পড়েছেন। মাঝেমধ্যে মনে হয় তিনি একা হয়ে পড়েছেন। তাই ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও আশঙ্কা অবশ করে দেয়। বিষাদগ্রস্ত মন, শরীরজুড়েও এনে দেয় ক্লান্তি। বন্ধুবরেষু নঈম নিজাম কিছুদিন আগে লিখেছিলেন, মুজিববর্ষ নিয়ে কী হচ্ছে? একদল চাটুকার মুজিববর্ষের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালীদের উৎসবে মেতে উঠেছেন। নানা মতলবে অনেকে ভিড় করছেন। কেউ কেউ এসব নিয়ে লিখেনও না। বলেনও না। সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে বন্ধু সৈয়দ বোরহান কবির দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। কিন্তু রক্তে তাঁর সাংবাদিকতা। পড়াশোনা, পর্যবেক্ষণ তাঁর নেশা। মাঝেমধ্যে তিনি যা লেখেন গণমাধ্যমের দৃশ্যমান মোড়লরা তাও করেন না। সবাই যার যার নির্লজ্জ ধান্ধাবাজিতে ব্যস্ত। এ দেশের মানুষ যাদের সিনেমা এখন দেখে না, সেসব নায়ক-নায়িকাকে নিয়ে অনেকে নাকি বঙ্গবন্ধুর জীবনীনির্ভর চলচ্চিত্র তৈরি করছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কেউ কেউ নাকি এসবে জড়িতও আছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত বলতে হয়েছে, মুজিববর্ষ নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না। তাঁর নির্দেশ কতটা পালন হচ্ছে, তা নিয়ে কোথাও কোনো কথাবর্তা নেই।

আরেক পক্ষ আছেন, হিন্দুত্ববাদের ধর্মান্ধ রাজনীতি দিয়ে ভারতের ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মুজিববর্ষে কেন আসবেন এ প্রশ্ন তুলে বিতর্ক গড়তে। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সুমহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত সরকার ও তার জনগণ যে অবদান ও ভূমিকা রেখেছে, এই দেশ যত দিন থাকবে তত দিন তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ রাখতে হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিই আসবেন, সেটিই বাস্তব। পৃথিবীর সব দেশের শাসকরাই নানা কারণে আলোচিত, প্রশংসিত, সমালোচিতÑ সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বের কূটনৈতিক সম্পর্কই নয়, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে গভীর আবেগ-অনুভূতি জড়িয়ে আছে। সীমান্ত হত্যা থেকে তিস্তার পানিসহ নানা ইস্যুর সমাধান হবে কূটনৈতিক দেনদরবারে মধ্যে, সেটি আলাদা বিষয়।

যাক, যে কথা বলছিলাম। আমাদের বিদ্যমান রাজনীতিতে মন্ত্রীদের পদত্যাগের দাবি করা আকাশকুসুম কল্পনা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযুদ্ধের বীর সংগঠক থেকে বীর যোদ্ধাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বিতর্কের মুখে সেটি বাতিল হলেও এমন গর্হিত অপরাধে মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়নি। পিয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতির মুখেও বাণিজ্যমন্ত্রীকে সরে দাঁড়াতে হয়নি। শিক্ষামন্ত্রীর এ ধরনের  অমার্জনীয় অপরাধের জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা পর্যন্ত চাননি। নৈতিক দায় থেকে পদত্যাগ করে সরে দাঁড়াবেন, এমনটি আশাও করি না। সরকারি কলেজ, হাইস্কুলে প্রবল শিক্ষক সংকট। লেখাপড়ার মান নি¤œগামী। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতীকী চেহারায় শিক্ষার্থীদের অভ্যর্থনা গ্রহণ করেন কীভাবে? একবার বুকটাও কি কাঁপেনি? প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি আমার অন্তর থেকে এ অপরাধের শাস্তি চাইছি আজ।

 

সেদিন শাখাওয়াত হোসেন শফিককে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নেতা-কর্মীরা যে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন, সেখানে ৩২ নম্বরে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, এ রকম একটি সাধারণ বাড়ি আজ পৃথিবীর ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ। এখান থেকেই আমাদের জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্লোভ, দুর্ধর্ষ, সাহসী নেতৃত্বে গোটা জাতিকে উত্তালঝরা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঐক্যের মোহনায়ই মিলিত করেননি, ব্যালট রায়ে একক নেতৃত্বের হিমালয়ের উচ্চায়ই ওঠেননি, এই উত্তাল মার্চে জাতিকে স্বাধীনতার জন্য ডাক দিয়ে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন।  তাঁর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের শাসন অচল হয়ে গিয়েছিল। তাঁর নির্দেশই কেবল কার্যকর হয়েছিল। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বেলুচিস্তানের কসাই টিক্কা খান গণহত্যা চালিয়ে পূর্ব বাংলার কসাই হয়েছিলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকেই সারা দেশে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। ভারতের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী শুধু ১ কোটি শরণার্থীর সেখানে আশ্রয়, তাঁর সব নেতা-কর্মী গিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় অর্জন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহান নেতা হিসেবেই নন, বিশ্বের শোষিত মানুষের নেতা হিসেবে মহাকাব্যিক যুগের নায়কের মতো বিশ্বরাজনীতিতে বিরল নেতৃত্বের আসনে উঠে আসেন। বঙ্গবন্ধুই ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে সংবিধান, সংসদ ও রাজনীতিতে ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করে ধর্মনিরপেক্ষতার গৌরব মুছে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে খুনিদের শাস্তিই দেননি, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র এনেছেন।

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আমরা এখনো ফিরে পাইনি। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ দমন করলেও দেশে নীরবে সাম্প্রদায়িক শক্তি যে শক্তিশালী অবস্থান নিয়েছে, তা অস্বীকারের সুযোগ নেই। বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতের স্বাধীনতা এনেছিল কংগ্রেস। ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে ভারতের জনগণ স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন দিলেও তাদের স্বাধীনতা এসেছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর আলোচনার টেবিলে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নয়। নেহেরুর হাত ধরে ইন্দিরা যুগে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বৃহত্তম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীতে আলো ছড়িয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেসকে দিনে দিনে দুর্বল করা হয়েছে। অক্সফোর্ড আর হার্ভার্ডের মনমোহন সিং আর সালমান খুরশিদরা কংগ্রেসকে জনবিচ্ছিন্ন করেছেন। ভোটে আজ কংগ্রেসের করুণ পরিণতি। হিন্দুত্ববাদের স্লোগানে উগ্রপন্থি ধর্মান্ধ শক্তির ওপর ভর করে বিজেপির টানা মেয়াদের শাসনে আজ দিল্লিতে যে রক্ত ঝরেছে তা ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের মাধুর্যকে ধূসর করেছে। এখানে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা হারিয়েছি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই বিভীষিকাময় পরিস্থিতি অনেকে ভুলে গেছি। টানা ১১ বছরের ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের অনেকে ভুলে গেছেন বিএনপি-জামায়াত শাসনামলের ভয়াবহতার চিত্র। রাজনীতিতে বিএনপি সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন না করলেও দুর্বল ভঙ্গুর অবস্থায়। এখানে কাল শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে আমাদের দেশে ইসলামের নামে উগ্রপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান যে ঘটবে না সেই গ্যারান্টি কোথায়?

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

     আরো পড়ুন....

পুরাতন খবরঃ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০  
error: ধন্যবাদ!