ত্রিপুরায় তৃণমূলের সরকার গঠন শুধুই কি সময়ের অপেক্ষা?

স্বকৃত গালিব :

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। তাই ত্রিপুরাবাসী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন— পরের বার, মমতার সরকার।অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ত্রিপুরায় আগামী বিধাননসভা ভোটে তৃণমূলের লড়াইয়ের ‘কান্ডারি’। বলে গান লিখেছেন সন্দীপ চক্রবর্তী। তিনি ত্রিপুরার প্রথম সিপিএম মুখ্যমন্ত্রী, প্রয়াত নৃপেন চক্রবর্তীর নাতি।(আনন্দ বাজার,৩১ আগস্ট)।

অন্যদিকে ত্রিপুরা রাজা ও জনজাতির নিয়ে গঠিত দল ত্রিপরার প্রধান রাজা প্রদ্যুৎ বিক্রম মাণিক্য দেববর্মার একটি জনসমীক্ষা চালায় সেখানে ৫৫ শতাংশ ভোটই তৃণমূলের পক্ষে পড়ে এবং তিনি তৃণমূলকে এইমূহুর্তের ত্রিপুরার সব চেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে তুলে ধরেন।(দৈনিক স্যন্দন পত্রিকা ,২৭আগস্ট)।

আর প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দল থেকে নেতা কর্মীরা তৃণমূলে যোগ দিয়ে ত্রিপুরাকে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তুলছে।কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ত্রিপুরায় সরকার গঠনে তৃণমূলের কতটুকু সম্ভাবনা রয়েছে।আমরা পিছনে ফিরে গেলে দেখতে পায়।

বঙ্গ রাজনীতির ধারাপথের সঙ্গে ত্রিপুরার কিছু মিল আছে। এখানে যেমন সিপিএম নিয়ন্ত্রিত বামফ্রন্ট সাড়ে তিন দশক ধরে একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করেছে, ত্রিপুরাতেও তা-ই। তবে তা দু’দফায়। প্রথমে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৮, তার পরে ১৯৯৩ থেকে একটানা ২০১৮ পর্যন্ত। মাঝখানের পাঁচ বছর শুধু কংগ্রেস রাজত্ব ছিল। অর্থাৎ,বঙ্গে তৃণমূলের মতো ত্রিপুরায় বিজেপি-ও প্রথম ক্ষমতায় এসেছে বামফ্রন্টকে হটিয়েই ।

আবার বাংলার মতো ত্রিপুরাতেও ক্ষমতা হারানোর পরে গুটিয়ে গিয়েছে সিপিএম। জোশ-জৌলুস, জনভিত্তি সবই কমেছে। কংগ্রেসও ক্ষয়িষ্ণু। ফলে, বাংলায় যেমন ২০১১-র পরে বিরোধী পরিসরের শূন্যতা ভরাতে দ্রুত উত্থান হয়েছে বিজেপির, ত্রিপুরাতে তেমন ভাবে তৃণমূল সেই রকম ফাঁক দিয়ে উঠে আসতে চাইছে। অন্তত এখনকার প্রবণতা সেটাই।

যদিও তৃণমূলের সিলেবাসে ত্রিপুরা নতুন কিছু নয়। মমতা যখন বঙ্গের বিরোধী নেত্রী হিসেবে শাসক সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়ছেন, তখন থেকেই পাশের এই রাজ্যে তৃণমূলকে ছড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন তিনি। কারণ, তাঁর দিক থেকে সেটাও ছিল সিপিএমের-ই বিরুদ্ধে আর একটি আন্দোলন। তবে সেই উদ্যোগের শেষরক্ষা হয়নি।

ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত সুধীররঞ্জন মজুমদার, প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী মতিলাল সাহা,প্রাক্তন মন্ত্রী এবং অধুনা বিজেপি রতন চক্রবর্তীর মতো নেতারা কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন অন্তত দেড় দশক আগে। কংগ্রেসে থাকতেই সুধীরবাবুর সঙ্গে মমতার সুসম্পর্ক ছিল। তা এতটাই জোরালো যে, পরবর্তী কালে মহারাষ্ট্র নিবাস হলে তৃণমূলের সম্মেলনে কমিটি গঠনের সময় মমতাকে দলের সর্বভারতীয় প্রধান করার অন্যতম প্রস্তাবকও ছিলেন ত্রিপুরার সুধীর মজুমদার।

সুধীর-রতনের মতো প্রভাবশালী নেতাদের নিয়ে যাত্রা শুরু করেও তৃণমূল সেই সময় সাফল্য পায়নি। তার পিছনে একটি কারণ হয়তো ছিল সুধীরবাবুর সঙ্গে রতনবাবুর সম্পর্কের জটিলতা। সে যা-ই হোক, অচিরে ত্রিপুরায় তৃণমূলের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। নেতারা অনেকেই কংগ্রেসে ফিরে যান।

মমতা বাংলায় সিপিএম-কে ক্ষমতাচ্যুত করার পরে ত্রিপুরায় ২০১৩-য় বিধানসভা ভোট হয়। সাংগঠনিক সমস্যায় তৃণমূল তখন সেখানে প্রার্থী দেয়নি। মুখে বলা হয়েছিল, সিপিএমের বিরুদ্ধে ভোট ভাগ তৃণমূল চায় না।

অবস্থা বদলায় ২০১৪-র লোকসভা ভোটের আগে। তখন সুধীরবাবু প্রয়াত। রতনবাবুকে চেয়ারম্যান, সুরজিৎ দত্তকে সভাপতি করে আবার তৃণমূল গড়া হল। মমতা আগরতলায় আস্তাবল ময়দানে বিশাল সমাবেশ করলেন। সেই সময় কিছু জায়গায় পঞ্চায়েতও জিতেছিল তৃণমূল।

২০১৪-র লোকসভা ভোটে রতনবাবু এবং ভৃগুরাম রিয়াংকে তৃণমূল প্রার্থী করে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা গিয়েছিলেন প্রচারে। আগরতলা থেকে গাড়িতে কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে শান্তির বাজার। সেখানে তাঁর নির্বাচনী সভা হয়। এলাকাটি, শোনা গিয়েছিল, খুব ‘শান্তির’ নয়। তা সত্ত্বেও সবাই দেখেছিল, মমতার সভায় প্রচুর ভিড়। তাতে বাঙালি, উপজাতি সবাই আছেন। তৃণমূল জেতেনি। তবে ভাল ভোট পেয়েছিল।

বছর দুয়েকের মধ্যে ছবি আবার বদলাল। এ বার কংগ্রেস থেকে ভাঙিয়ে প্রভাবশালী সুদীপ রায়বর্মণ-সহ ছ’জন বিধায়ককে নিজেদের দলে নিয়ে এল তৃণমূল। নেপথ্যের কারিগর মুকুল রায়। রতন চক্রবর্তী, সুরজিৎ দত্তেরা তৃণমূল ছেড়ে গেলেন। আবার মুকুলবাবু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার পরে সুদীপ বর্মণেরাও মমতার সঙ্গে থাকলেন না।

এখন তো রতন-সুরজিৎ-সুদীপেরা সবাই পদ্ম-দলে বিধায়ক। তবে বিজেপি সরকারের মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছেন সুদীপ। তাঁর সঙ্গে দলের টানাপড়েন চলছে বলে জোরদার গুঞ্জন।আবার অনেকে বলছে সুদীপ বাবু তৃণমূলে যোগ দিয়ে ত্রিপুরায় মমতাকে আরেক পা এগিয়ে রাখবে।

এই আবহে আরও এক বার ত্রিপুরার ময়দানে তৃণমূল। আজ পরিস্থিতিতেও অনেক বদল ঘটে গিয়েছে। মোদী-শাহের মোকাবিলা করে বাংলায় বিপুল ভোটে মমতার দলের সদ্য ফিরে আসা যদি তার একটি হয়, অন্যটি তবে এই রাজ্যের মতো পেশাদারি কায়দায় ছক সাজানোর উদ্যোগ।

যেমন, ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের তৈরি সংস্থাকে এ বার বাংলায় তৃণমূলের জন্য কাজে লাগিয়েছিলেন অভিষেক, যার ‘সুফল’ মিলেছে। ত্রিপুরায় তাদেরই তিনি ‘জল মাপতে’ দায়িত্ব দেন। সেই সমীক্ষক দলকে আটকানোর অভিযোগ থেকে পরবর্তী সংঘাতের সূত্রপাত।

শোনা যাচ্ছে, সমীক্ষার প্রাথমিক রিপোর্ট যাচাই করেই নাকি তৃণমূল এ বার ত্রিপুরায় পা রেখেছে। তারা মনে করে, বাংলায় চৌত্রিশ বছর পরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সিপিএম-কে রাজ্যের মানুষ যেমন এখন ‘ভরসা’ করতে পারছেন না, ত্রিপুরার বেলাতেও সেই যুক্তি প্রযোজ্য হবে। বিকল্পের দৌড়ে তৃণমূলের এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা তাই উড়িয়ে দেওয়া চলে না।

তবে মানতেই হবে,‘গণতন্ত্র’-এর ফলিত প্রয়োগে বিজেপি শাসিত ত্রিপুরার চেয়ে মমতার বাংলা এখনও অনেক পিছিয়ে! এখানে ‘রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে’ উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকলেও গত পঞ্চায়েতে ৩৪ শতাংশের বেশি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিততে পারেনি শাসক তৃণমূল। আর ত্রিপুরায় বিজেপি একতরফা দখল করেছে ৮৬ শতাংশ!

বিধানসভা ভোট কী ছবি দেখাবে, এটা সময়ই বলবে। আর ত্রিপুরেশ্বরীর রাজ্যে এখন থেকেই প্রশ্ন জরালো হচ্ছে,পরের বার, মমতার সরকারই দরকার।

লেখক: শিক্ষার্থী, স্নাতকোত্তর, আইন বিভাগ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যায় সাংবাদিক সমিতি (কুবিসাস)।

     আরো পড়ুন....

পুরাতন খবরঃ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
error: ধন্যবাদ!